শুল্ক বৈষম্য ও নীতিমালার অভাব

প্লাস্টিকের কাছে হারছে পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্য

বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত প্লাস্টিকের মাত্র ১০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল করা হয়।

বাকি প্লাস্টিক গিয়ে পড়ছে নদী ও সমুদ্রে। প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয় সমুদ্রে, যা চার হাজারের বেশি সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি করছে। এ দূষণ রোধে প্লাস্টিকের উৎপাদন কমানো ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্য তৈরি করা জরুরি বলে মনে করে ওয়ার্ল্ড ওশেন অ্যাসেসমেন্ট কর্তৃপক্ষ। তবে বাজারে সস্তা প্লাস্টিকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না টেকসই বিকল্প পণ্যগুলো।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনসিটিএডি) মতে, প্লাস্টিক ও এর বিকল্প পণ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাণিজ্য নীতি ও শুল্ক কাঠামোর বৈষম্যই এর প্রধান কারণ। গত ৩০ বছরে প্লাস্টিক ও রাবার পণ্যের শুল্ক ৩৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। অন্যদিকে কাগজ, বাঁশ, প্রাকৃতিক আঁশ ও শৈবালের (সিউইড) মতো পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্যের ওপর গড় শুল্ক দ্বিগুণ, অর্থাৎ ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ বহাল রয়েছে। ফলে পরিবেশবান্ধব পণ্যগুলোর উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্য বেশি পড়ছে।

জাতিসংঘের মতে, প্লাস্টিক শিল্প দীর্ঘ সময় ধরে বড় বাজার, উন্নত অবকাঠামো ও অনুকূল বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছে। ফলে এর উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে।

যুক্তরাজ্যের নটপ্লা কোম্পানির প্রতিনিধি বেন টেলর জানান, কয়েক দশক ধরে প্লাস্টিকের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী যে প্যাকেজিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা পরিবর্তন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথাকথিত ‘বায়োডিগ্রেডেবল’ বা পচনশীল প্লাস্টিকের কার্যকারিতা নিয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক নতুন পচনশীল প্লাস্টিক কেবল শিল্প-কারখানার নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায়ই মাটির সঙ্গে মেশে। সমুদ্রে বা স্বাভাবিক পরিবেশে এগুলো সহজে পচে না। এছাড়া উদ্ভিদভিত্তিক প্লাস্টিক তৈরির কারণে খাদ্য উৎপাদন উপযোগী জমির সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে প্লাস্টিকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইউরোপের বাজারে পলিথিন রেজিনের দাম প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে নবায়নযোগ্য বা পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্যের চাহিদা ও সম্ভাবনা তৈরি হয়। এক্ষেত্রে সামুদ্রিক শৈবাল একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উপাদান বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এটি কোনো মিঠা পানি, সার বা ফসলি জমি ছাড়াই দ্রুত বাড়ে এবং পুরোপুরি পচনশীল। গত দুই দশকে বিশ্বে শৈবালের উৎপাদন তিন গুণ বেড়েছে। ২০২২ সালে এর রফতানি দাঁড়িয়েছে ৩৯০ কোটি ডলারে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় শৈবাল নিয়ে স্পষ্ট ও সমন্বিত নীতিমালার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ আছে প্রতিবেদনে।

তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে উৎপাদিত ৩ কোটি ৬৩ লাখ টন শৈবালের মধ্যে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন আন্তর্জাতিকভাবে কেনাবেচা হয়েছে।

জাতিসংঘের মতে, প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের বাজার বড় করতে হলে শুল্কের বৈষম্য দূর করতে হবে ও নতুন পরিবেশবান্ধব উপাদানের গবেষণায় বিনিয়োগ ও অবকাঠামো বাড়াতে হবে। শুরুতে এতে বাড়তি খরচ হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা পরিবেশ রক্ষা ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

আরও